Breaking

Friday, February 8, 2019

গত এক বছরে ১৬২ জনকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছে নিম্ন আদালত


২০১৮ সালে নিম্ন আদালতের রায়ে ১৬২ জনকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়েছে। গত দু’দশকের হিসাবে এক বছরে এতগুলি ফাঁসির আদেশ কোনও দিনই হয়নি। সম্প্রতি নয়াদিল্লি জাতীয় আইন বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফ থেকে বারতে মৃত্যুদন্ডের বিষয়ে সমীক্ষা চালাতে গিয়ে এই রিপোর্ট উঠে এসেছে। 

    বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফ থেকে ভারতীয় মৃত্যুদন্ডের ইতিহাস বিষয়ে একটি বিশেষ বিভাগে গবেষণা করছেন অধ্যাপক মৈত্রেয়ী মিশ্র। তিনি বলেছেন, ২০০০-২০১৫ সাল পযর্ন্ত ৫ শতাংশের নিচে মৃত্যুদন্ডের হার ছিল। দেশের মোট অপরাধী যারা পিনরাল কোর্ডের ধারায় অধিযুক্ত, সেই সংখ্যার নিরিখে এই সমীক্ষাটি করা হয়েছিল। কিন্তু ২০১৮ সালের হিসাব অতীতের যাবতীয় রেকর্ডকে ভেঙে দিয়েছে। ২০১৮ সালের আইনী নথি বলছে, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের উচ্চ ন্যায়ালয়ে ৫৫ জনের ফাঁসির আদেশ বহাল রেখেছে। এই ৫৫ জনের মধ্যে ৯ জনকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছিল নিম্ন আদালত। এই ৫৫ জন মৃত্যুদন্ডে সাজাপ্রাপ্ত আসামীর মধ্যে ২৪ জন যৌন নির্যাতনের জন্য অভিযুক্ত।

    ভারতের সমস্ত প্রদেশের মধ্যে ২০১৮ সালে সবথেকে বেশি মৃত্যুদন্ডের রায় শুনিয়েছে মধ্যপ্রদেশের একাধিক দায়রা আদালত। সেখানে ২২ জনকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়েছে। অথচ মধ্যপ্রদেশে ২০১৭ সালে মাত্র ৬ জনকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছিল নিম্ন আদালত। সুতরাং সংখ্যা তত্ত্বের বিচারে প্রায় সাড়ে তিনশো শতাংশেরও বেশি মৃত্যুদন্ডের আদেশ মধ্যপ্রদেশ রাজ্য আইন দপ্তর দিয়েছে। একই চিত্র কর্নাটকেও। সেখানে ২০১৭ সালে মাত্র দু’জনকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছিল নিম্ন আদালত। 

    আর এক বছরের মধ্যে সেই সংখ্যাটা বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ১৫-এ। উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র এবং তামিলনাডুতে অবশ্য চিত্রটা একটু আলাদা। সেখানে ভারতীয় দন্ডবিধির চরম সাজাপ্রাপ্তের সংখ্যা গত এক বছরে কমেছে। মহারাষ্ট্রে ২০১৭ সেখানে ২২ জনকে মৃত্যুর আদেশ দেওয়া হয়েছিল, ২০১৮ সালে তা কমে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১৬-তে। উত্তরপ্রদেশে ২০১৭ সালে নিম্ন আদালতের রায়ে ১৮ জনকে ফাঁসির সাজা শুনতে হয়েছিল। আর গত বছর সংখ্যাটা কমে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১৫-এ। তামিলনাডুতে খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। ২০১৭ সালে ১৩ জনের ফাঁসির আদেশ হয়েছিল আর ২০১৮ সালে তা ১২-তে নেমেছে।

    ২০০৫ সাল থেকে ২০১৮ সাল পযর্ন্ত সুপ্রিম কোর্টের কাছে হাইকোর্টের রায়ের ভিত্তিতে ১২টি মৃত্যুদন্ত সংক্রান্ত মামলা চলছিল। বিভিন্ন সমযের পরিপ্রেক্ষিতে এই ১২টি মৃত্যুদন্ডের মামলার মধ্যে ১১টিতেই চুড়ান্ত সম্মতি দিয়েছে ভারতের সর্বোচ্চ ন্যায়ালায়। যার মধ্যে আজমল কাসভের ফাঁসির মামলাও রয়েছে। নিম্ন আদালতগুলিতে কেন মৃত্যুদন্ডের সংখ্যা বাড়ছে তাই নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছেন নয়াদিল্লির জাতীয় আইন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপিকা রুচি চৌধুরী। পসকো আইনের ৩৬৫, ৩৬৬ (ক), ৩৭৬ ধারাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন রুচি। তিনি বলেছেন, ‘যে ১৬২ জনের ফাঁসির আদেশ বিভিন্ন রাজ্যের নিম্ন আদালতগুলি দিয়েছে, তার সিংহভাগই শিশুদের ওপর শারীরিক নিগ্রহের জন্য।’

    ভারতীয় আইন ব্যবস্থায় মৃত্যুদন্ড নিয়ে একাধিকবার সরব হয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের বিচাপতি কুরিয়ান জোসেফ। হিমাচল প্রদেশ হাইকোর্টের মুখ্য বিচারপতি থাকাকালীনও তিনি মৃত্যুদন্ডের বিরুদ্ধে সরব ছিলেন। তিন তালাক বিরুদ্ধে রায় দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টিকারী জোসেফ বলেছিলেন, ‘মৃত্যুদন্ড কোনও দিন কোনও সমাজের অপরাধকে বদলে দিতে পারে না। তাই এটি কখনও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হিসাবে পরিগণিত হতে পারে না। আমি নিজে ফাঁসি বা যেকোনও ধরনের মৃত্যুদন্ডের বিরুদ্ধে আমৃত্যু প্রতিবাদ করব।’ 

    সুপ্রিম কোর্টের অন্যতম প্রবীণ আইনজীবী মিলন মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ‘নিম্ন আদালত কাউকে ফাঁসির আদেশ দিলে সেটা সর্বোচ্চ হয় না। উচ্চ আদালত আসামীর আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি, কোন ক্ষেত্রে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, আসামীর পূর্বে কোনও অপরাধ প্রবণতা ছিল কিনা, এমনকী জেলে তার আচরণ ইত্যাদি একাধিক বিষয়ে বিচার করে তবেই সিদ্ধান্ত নেন।’

    উল্লেখ্য, গত ১৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শিশুদের ওপর শারীরিক নিগ্রহের অপরাধে অভিযুক্তদের চুড়ান্ত শাস্তি দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন।

No comments:

Post a Comment