Breaking

Wednesday, January 30, 2019

আট হাজার সন্তানের মা হয়ে পদ্মশ্রী পেলেন শতায়ু থিম্মাক্কা


বন্ধ্যা অপবাদ দিয়ে একদা একঘরে করেছিল সমাজ। পরিবেশ রক্ষার একক লড়াইকে কুর্নিশ জানাল সরকার। 

    বন্ধ্যা বলে রক্ষণশীল সমাজ তাকে একঘরে করে দিয়েছিল। জাম্পকাট।

   সাত দশক বাদে আট হাজার ‘সন্তানের’ জননী হয়ে পদ্মশ্রী পেলেন সেই মহিলা। সালুমারাদা থিম্মাক্কা। বর্তমানে তিনি ১০৭ বছরের প্রবীণা! কর্নাটকে তার অপর নাম ‘বৃক্ষমাতা’। 

    সংস্কৃতে একটি শ্লোক ছিল, যা পরবর্তী সময়ে বাংলা প্রবাদে পরিণত হয় – পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্ষা। আরও ভেঙে বললে, সন্তান উৎপাদনই একজন স্ত্রীর কাজ। বলতে কুন্ঠা নেই, আজকের তুমুল প্রযুক্তি সভ্যতার যুগেও বহু রক্ষণশীল পরিবারে স্ত্রীকে মূলত সন্তান উৎপাদনের মাধ্যম হিসাবে গণ্য করা হয়। সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, এই বোধ আদতে সমাজের অসুখ। আজ থেকে সাত দশক আগে এই সামাজিক অসুখেরই শিকার হয়েছিলেন থিম্মাক্কা। শতাধিক বছর আগে কর্নাটকের তামাকুরু জেলার একটি গ্রামে দিনমজুর দম্পতি চিক্কারানগয়া ও ‍বিজয়াম্মার ঘরে আসে ফুটফুটে কন্যাসন্তান। আদর করে মেয়ের নাম রাখা হয় থিম্মাক্কা। গরিব ঘরে মেয়েকে আর স্কুলে পাঠানো সম্ভব হয়নি। বাবা-মাকে সাহায্য করতে অল্প বয়সেই দিনমজুরির কাজ শুরু করে সেই মেয়ে। কিশোরী বয়সেই খেতমজুর বেক্কালু চিক্কাইয়ার সঙ্গে থিম্মাক্কার চার হাত এক হয়ে যায়। টাকাপয়সার অভাব থাকলেও নবদম্পতির জীবনে সুখের অভাব ছিল না। এদিকে বছর পেরিয়ে যায় কিন্তু থিম্মাক্কার গর্ভে সন্তান আসে না। পুত্র বা কন্যা দূরের কথা, বিয়ের ২৫ বছর পরেও নিঃসন্তান থেকে যান এই দম্পতি। যত দোষ গিয়ে পড়ে ঘরের বউয়ের উপর। সেই ‘অপরাধে’ গ্রাম্য সমাজ তাকে একঘরে করে দেয়। সমাজ ও চারপাশের দুনিয়া থেকে একা হয়ে পড়েন থিম্মাক্কা। সমাজ তাকে একা করে দেয় ঠিকই, কিন্তু তার নারী সত্তাকে দমন করতে পারেনি। সামাজিক সংকীর্ণতা ভেঙে তিনি ক্রমে হয়ে উঠলেন আট হাজার সন্তানের ‘মা’। আর সেই অপার সন্তানস্নেহই শত বসন্ত পার করা থিম্মাক্কাকে এনে দিল পদ্মশ্রী পুরস্কার। 

    গর্ভধারণ না করতে পারলে একজন নারী পূর্ণতা পায় না – সনাতনী এই ভ্রান্ত মিথ থেকেই গ্রাম-সমাজের রোষানলে পড়তে হয় এই দম্পতিকে। বেক্কালু চিক্কাইয়ার বদলে থিম্মাক্কার উপরেই সমাজের নীতিবাগীশদের রোষ ছিল বেশি। কারণ তাদের কল্পিত ‘সু-সমাজে’ বন্ধ্যা নারীর কোনও স্থান ছিল না। থিম্মাক্কার লেখাপড়া ছিল না। স্বামী চিক্কাইয়ারও ছিল না নিজের জমিজমা। গ্রামের আর পাঁচটা দরিদ্র পরিবারের মতোই দিনমজুরি করে কায়ক্লেশে চলত তাদের সংসার। পয়সা কম ছিল বটে কিন্তু সংসারে শান্তি ছিল, সুখ ছিল। অসহনীয় ছিল কেবল সমাজের দুর্ব্যবহার। শুধু একঘরে করে রাখাই নয়, কাজের জায়গাতেও বিনা প্ররোচনায় সহকর্মীদের ঠাট্টা ও আক্রমণের মুখে পড়তেন এই নিঃসন্তান দম্পতি। 

    থিম্মাক্কাই বদলার পথ খুঁজছিলেন। তার মনে হয়েছিল, অহেতুক এই অসম্মান বরদাস্ত করে যাওয়া মূর্খামি। সমাজের বিরুদ্ধে যেন এক প্রতিশোধস্পৃহা জেগে ওঠে থিম্মাক্কার। তবে সে প্রতিশোধ ছিল দূড়ান্ত ইতিবাচক এক পদক্ষেপ। থিম্মাক্কা স্থির করেন, জমি ফাঁকা পেলেই সেখানে বটের চারা রোপণ করবেন। সন্তানসম স্নেহে বড় করে তুলবেন একটি গাছ। সন্তান নেই তো কী হয়েছে, গাছকেই তিনি সন্তানের মতো লালন-পালন করবেন। সমাজকে দেখিয়ে দেবেন, মাতৃত্বের অর্থ শুধু শরীরের ভিতরে নিছক একটি ভ্রণ ধারণ করা নয়, মাতৃত্বের মানে কেবল শরীরের ভিতর থেকে একটি মানবসন্তানের জন্ম দেওয়া নয়। মাতৃত্ব মানে অপত্য। মাতৃত্ব মানে নতুন এক প্রাণের জন্ম।

    ভাবনা বাস্তবে রূপ পেতে বেশি সময় নিল না। সে প্রায় ষাট বছর আগের কথা। প্রথমে বছরে ১০টি বটগাছ লাগালেন থিম্মাক্কা। বাড়ি থেকে চার কিলোমিটার দূরে, একটি খালি জায়গায় গিয়ে গাছগুলি লাগিয়েছিলেন। তার কথায়, ‘ওই দশটি গাছই আমার প্রথম সন্তান।’ পরের বছর গাছের সংখ্যা বেড়ে হল পনেরো। তার পরের বছরে কুড়ি। তিন বছরের মাথায় ৪৫টি সন্তান নিয়ে ভরা সংসার সালুমারাদা থিম্মাক্কা। সন্তানদের আরও ভাল ভাবে দেখভালের জন্য দিনমজুরের কাজ ছাড়লেন স্বামী চিক্কাইয়া। সারা দিন ধরে কেবল গাছের সঙ্গেই ঞাকেন। আর গৃহকত্রী মজুরের কাজ সেরে দুটো পয়সা নিয়ে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে একাধারে স্বামী ও সন্তানদের পরিচর্যায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। প্রতিদিন চার কিলোমিটার পথ পেরিয়ে গাছগুলিতে জল দিতেন তারা। গরু-ছাগলের হাত থেকে চারাগুলিকে বাঁচাতে এই দম্পতি নিজের হাতে লাগিয়েছিলেন কাঁটাতারের বেড়া। থিম্মাক্কার নিজের গ্রাম হুলিকাল থেকে কুদুর পযর্ন্ত মোট ২৮৪ টি বটের চারা রোপণ করে বড় করেন তিনি। প্রায় চার কিলোমিটার পথ জুড়ে সারবন্দি দাঁড়িয়ে থাকা সুবিশাল বটবীতি আজ থিম্মাক্কার নিজস্ব ভুবন।


    ১৯৯১ সালে মারা যান চিক্কাইয়া। স্বামীর মৃত্যু তাকে সন্তানস্নেহ থেকে তিলার্ধ দূরে সরাতে পারেনি। এ বার শুরু হয় তার ‘সন্তানদের’ বড় করার একক লড়াই। এই সময়ে থিম্মাক্কার কাজে মুগ্ধ হয়ে, তার প্রতি সম্মান দেখিয়ে  গ্রামবাসীরাই তার নাম দেন ‘বৃক্ষমাতা’। যারা তাকে একদা একঘরে করেছিলেন, তারা বুঝতে পারেন, সন্তান জন্ম দিতে না পালেও নিঃশব্দে অনেক বড় এক ধারণার জন্ম দিয়েছেন থিম্মাক্কা। জন্ম দিয়েছেন আস্ত এক অরণ্যের। স্থানীয় মহলে লোকের মুখে মুখে তার কথা ফিরতে থাকে। ১৯৯৬ সালে তিনি পান ‘নাগরিক জীয় সম্মান’। থিম্মাক্কার কথা জানতে পারে গোটা দেশ। একধিক আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা তাকে সহায্য করতে এগিয়ে আসে। বর্তমানে থিম্মাক্কার গাছগুলির দেখভালের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়েছে কর্নাটক সরকার। তবে সরকারের এই প্রয়াসে খুশি হননি বৃদ্ধা। তার কথায়, ‘ওরা আমার নিজের সন্তান। নিজের সন্তানের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিচ্ছে অন্য কেউ, এটা কোনও মায়ের কাছেই কাঙ্খিত নয়।’ দায়িত্ব নিলেও কর্নাটক সরকারও মনে করে, এই আট হাজার সন্তানের মা আসলে থিম্মাক্কা। এই  প্রজাতন্ত্র দিবসে পদ্মশ্রী পুরস্কার প্রাপক হিসাবে তার নাম ঘোষিত হয়েছে। পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়নের কারণেই তাকে দেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ পদ্ম পুরস্কারে ভূষিত করেছে কেন্দ্রীয় সরকার।

No comments:

Post a Comment