Breaking

Friday, January 18, 2019

কোনও সেলিব্রেশন নয়, ঘরের ছেলে সুস্থভাবে ঘরে ফিরে আসুক চাইলেন সত্যরূপের মা


সপ্তম আগ্নেয়গিরি শৃঙ্গ জয় করে দক্ষিণ কলকাতার পর্ণশ্রী এলাকার সিদ্ধান্ত পরিবার এখন সেলেব। বুধবার বাড়ির বড়ছেলে সত্যরূপ সিদ্ধান্ত কনিষ্ঠতম ভারতীয় হিসাবে সতটি আগ্নেয়গিরি জয়ের দৃষ্টান্ত রেখেছেন। আর তাই বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই পর্ণশ্রীর সিদ্ধান্তদের বাড়িতে মিডিয়ার লোকেদের আনাগোনা। সত্যরূপের মা গায়েত্রী দেবীর প্রতিক্রিয়া জানার জন্য উৎসুক মিডিয়ামহল। কিন্তু একেবারেই নিরুত্তাপ গোটা পরিবার। এখন তাদের একটাই কামনা – ঘরের ছেলে সুস্থভাবে ঘরে ফিরে আসুক। পর্ণশ্রী জুড়ে বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে ছোট ছোট ক্লাব সংগঠনগুলি সত্যরূপের ব্যানার, ফেস্টুন ছাপিয়ে কেউ লিখেছে, ‘আমাদের পাড়ার ছেলের জন্য আমরা গর্বিত’, আবার কারের ক্যাপশন, ‘জয়তু সত্যরূপ’। 

    ছোট থেকেই অ্যাজমার সমস্যায় ভুগছিল ছেলে, এমন কথা জানালেন গায়েত্রী দেবী। দ্বিতীয় শ্রেনীতে পড়া পযর্ন্ত অ্যাজমার সমস্যায় মাঝে মধ্যেই কাহিল হয়ে পড়ত সত্যরূপ। তাই তাকে সুস্থ রাখতে সাঁতারে ভর্তি করতে হয়েছিল। সত্যরূপের বাবা শুভময়বাবু ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের মেডিক্যাল অফিসার। তাই জীবনের দীর্ঘসময়, কাযর্ত স্কুল জীবন তাদের কেটেছে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর কখনও বা ইসলামপুরে। 

    একদিন যে ছেলে গাছে চড়তে ভয় পেত, সেই ছেলে যেদিন এভারেস্ট অভিযানের কথা তার বাবাকে বলেছিল, তখন স্বাভাবিক ভাবেই আপত্তির সুর ভেসে উঠেছিল শুভময়বাবুর গলা থেকে। কিন্তু ছেলের পাশে বরাবর দাঁড়িয়েছিলেন গায়েত্রী দেবী। গুরুদাস তারাসুন্দরী ইনস্টিটিউট থেকে দ্বাদশ শ্রেনীর পরীক্ষা দিয়েছিল সত্যরূপ। ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তরফ তেকে গত বুধবারই তাদের প্রাক্তনীকে সম্মান জানিয়ে পুষ্পস্তবক পাঠানো হয়েছে। অজস্র ফুলের তোড়া আর উপহারের মোড়কে ঢাকা পড়ে গিয়েছে সিদ্ধান্ত পরিবারের এক তলার সবার ঘর। 

    কিন্তু গায়েত্রী দেবীর হুঁশ কিছুতেই নেই। বুধবার ভোর থেকেই তার একটাই ঠিকানা রাধাকৃষ্ণ জীউয়ের প্রতিষ্ঠিত মূর্তির সামনে। ‘ভোরবেলা যখন দীপাঞ্জন (দীপাঞ্জন দাস, সত্যরূপের বন্ধু) আমাকে ফোনে জানাল ও শৃঙ্গ জয়ের কাছাকাছি পৌঁছেছে, কথনই আর নিজেকে স্থির রাখতে পারলাম না। সোজা গিয়ে রাধাকৃষ্ণের সামনে দাঁড়ালাম।’ ওই পুজোর আসনে বসা গায়েত্রী দেবীকে সকাল প্রায় সাড়ে ন’টা নাগাদ দীপাঞ্জন প্রথম জানিয়েছিলেন, সত্যরূপ মাউন্ট সিডল জয় করেছেন। আর তারপর থেকেই গায়ত্রী দেবীর আশঙ্কার পারদ যেন ক্রমে চড়ছে। কারণ, ‘ঘরপোড়া গরু তো, তাই ছেলেকে হাতের কাছে না পেয়ে কোনও কিছুই ভাল লাগছে না। ওসব বিশ্বরেকর্ড-টেকর্ডের কথা প্লিজ বলবেন না’, জানালেন প্রাক্তন অধ্যাপকা তথা সত্যরূপের মা। কারণ গত ৬ ডিসেম্বর য়ষ্ঠ আগ্নেয়গিরি মেক্সিকোর পিকো ডে ওরিজবা জয় করে যখন নিচে নামছিলেন, তখনই দুর্ঘটনায় আঘাত পান তিনি। আর তার সঙ্গে থাকা গাইডের পা ভেঙে যায়।

    ২৬শে জানুয়ারী ভোরে কলকাতা বিমানবন্দরে আসবেন সত্যরূপ। ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের তরফ থেকেও সত্যরূপকে সংবর্ধনা জানানোর পরিকল্পনা করতে আধিকারিকরা হাজির হয়েছেন পর্ণশ্রীর বাড়িতে। প্রাথমিক ভাবে স্থির হয়েছে, দিল্লিতেই অভিভাসন জনিত যাবতীয় পরীক্ষা পর্ব মিটিয়ে দ্রুত কলকাতায় নিয়ে আসা হবে তাকে। সেখান থেকে কনভয়ের মাধ্যমে সত্যরূপ পৌঁছবেন বেহালার নিজের বড়িতে। তারপর কবে সংবর্ধনা দেওয়া হবে তা এখনও সরকারি ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। 

    সংবর্ধনা সেলিব্রেশনের খসড়া নিয়ে সত্যরূপের বাবার সঙ্গে আলোচনা করতে চেয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের ক্রীড়া দপ্তরের আধিকারিকরা। কিন্তু হঠাৎই গায়েত্রী দেবী পুজোর ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, ‘ওসব সেলিব্রেশন টেলিব্রেশন থাক না এখন। আগে ছেলে সুস্থভাবে ঘরে ফিরুক তারপর এসব নিয়ে না হয় আলোচনা করা যাবে।’ মন মানছে না পাড়ার খুদেদের। ২৬শে জানুয়ারী ভোরে যখন সত্যরূপ আসবে, তখন কোনও ক্লাব ছড়াবে ফুল, আবার কেউ ভোরেই ওড়াবে বেলুন।

No comments:

Post a Comment