Breaking

Monday, January 21, 2019

তিনশো বছর ধরে রহস্যে ঘেরা শনি-সিঙ্গনাপুর।


গ্রামের ঘর থেকে দোকান নেই দরজা এমনকী ব্যাঙ্কের সদরেও পড়ে না তালা

    যা আছে ভূ-ভারতে, তাই আছে ভারতে! বিশ্বের কোনও প্রান্তে এমন কোনও চমক নেই, যা পাওয়া যাবে না ভারতে। এই দেশেই এমন এক গ্রাম রয়েছে, যেখানে সদর দরজা বন্ধ করে রাকা তো দূরের কথা, কোনও বাড়িতে সদর দরজাই নেই। দুরি ডাকাতি ছিনতাই, কোনও কিছুর বালািই নেই গ্রামে। দীর্ঘ বছর এলাকায় কোনও থানাই ছিল না, হয়েছে ২০১৫ সালে। শুধুমাত্র পযর্টকদের ভিড় সামলানো ছাড়া থানার কর্মীদের অন্য কোনও কাজ নেই। গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে অহোরাত্র হাট করে খোলা থাকে সদর। ‘চুরি’ শব্দটাই এই গ্রামের কাছে অজানা। মহারাষ্ট্রের আহমেদনগর জেলায় অবস্থিত গ্রামটির নাম শনি-সিঙ্গনাপুর। দূরের মানুষ অনেকেই গ্রামটিকে বলেন শুধু সিঙ্গনাপুর। আবার কেউ ছোট করে উল্লেখ করেন ‘সোনাই’। 

    আহমেদনগর জেলা শহর থেকে ২৪ কিমি দূরে নাভাসা তালুকের মধ্যে এই গ্রাম। গ্রামে রয়েছে ‘জাগ্রত’ শনি মন্দির। তা থেকেই গ্রামের নামের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে শনিঠাকুরের নাম। ছোট্ট গ্রাম, কিন্তু প্রতি পরতে লুকিয়ে রয়েছে অপার বিস্ময়। জড়িয়ে রয়েছে এক দীর্ঘ ইতিহাস। গ্রামের সকলে শনিঠাকুরের ভক্ত। সকলে বিশ্বাস করেন, শনিঠাকু্রই তাদের সবার রক্ষাকর্তা। শনিদেবের আর্শীবাদেই রি হয়েছে ঐশ্বরিক নিরাপত্তাবেষ্টনী। যা গোটা গ্রামকে চোখের মণির মতো রক্ষা করে চলেছে। 

    এই কারণে গ্রামের ত্রিসীমানায় ঢুকতে ভয় পায় দুষ্কৃতিরা। আর তাই গত ৩০০ বছর গ্রামের কোনও বাড়িতে সদর কপাটশূন্য। শুধু গৃহস্থের বাড়িতে নয়, দোকানপাট, অফিস, হোটেল-রেস্তোরাঁ, এমনকী থানাতেও সদরে কটাট নেই। এখানেই শেষ নয়, এখানে রয়েছে ইউকো ব্যাঙ্কের শাখা। নাম-কো-ওয়াস্তে ব্যাঙ্কে সদর দরজা আছে বঠে, কিন্তু কোনওদিন সেই দরজায় তালা পড়ে না। গ্রামের প্রবীণদের বিশ্বাস, দরজায় তালা লাগানো মানে শনিঠাকুরের অধিষ্ঠানকে অবিশ্বাস এবং তাচ্ছিল্য করা। যে দিন গ্রামের কোনও বাড়ির দরজায় তালা লাগবে, শনিঠাকুরের অভিশাপ নেমে আসবে গ্রামবাসীদের মাথায়। 

    শুনতে গ্রাম হলেও সিঙ্গনাপুর আদতে শহর। আয়তনে প্রায় ৮২ বর্গ কিলোমিটার। ভাষা মারাঠি। প্রায় চার হাজারের আবাদি। সিংহভাগ মানুষের পেশা চাষবাস। গ্রামে আখের ফলনই বেশি। এখানে চিনিকলও রয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৭০০ টন চিনি তৈরি হয় কারখানায়। ২০১১ সালের জানুয়ারীতে শনি-সিঙ্গনাপুরে কাখ খোলে ইউকো ব্যাঙ্ক। বর্তমানে গ্রাহক সংখ্যা হাজার দশেক। কাচের দরজা থাকলেও আজ পযর্ন্ত একটি দিনের জন্যেও ব্যাঙ্ক বন্ধের পর তাতে তালা লাগানো হয়নি। ব্যাঙ্ক কর্তাদেরও বিশ্বাস, তালা ছাড়াই তাদের এই শাখা বেশি সুরক্ষিত থাকে। টাকা-পয়সা স্ট্রংরুমে তোলা থাকলেও সদর দরজায় মঙ্গেশ রাখশে বলেন, ‘গত ৮ বছরে এই শাখায় একটিও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।’

    সবই নাকি শনিঠাকুরের মাহাত্ম্য। গ্রামবাসীদের মুখে মুখে ফেরে শনিদেবের মাহাত্মের কথা। গ্রামের মাঝখানে শনিদেবের বিশাল প্রস্তরমূর্তি। প্রস্তরখন্ডটির দৈর্ঘ্য দেড় মিটার। পাথরে সোনা-রুপো বসানো। সেই প্রস্তরমূর্তিও রয়েছে খোলা আকাশের নিচে। গ্রামবাসীরা বিশ্বাস করেন, একানে কেউ অসৎ হলে শনিদেবের রোশানল থেকে সে মূক্তি পাবে না। তাই গ্রামে কেউ অপরাধ করে না। প্রবীণ বাসিন্দা শ্রীরাম ঘোড়বলের কথায়, ‘মাথার উপর ইষ্টদেবতা আছেন। তাই কারও কোনও চিন্তা নেই। গ্রামে যদি কেউ দরজায় তালা লাগানোর কতা ভাবি অথবা দরজায় কপাট লাগানোর কথ, তা হলে গ্রামে অনির্বায ভাবে কোনও দুর্ঘটনা ঘটে যাবে, ক্ষতি হবে ব্যবসায়।’ 

    শনিঠাকুরের প্রস্তরমূর্তি নিয়েও গ্রামে প্রচুর লোকগাথা রয়েছে। প্রবীণ মানষেরা বলেন, একবার ভয়ানক প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়েছিল এই গ্রাম। তখন গ্রামের নাম ছিল শুধু সিঙ্গনাপুর। বন্যায় ভেসে গিয়েছিল অধিকাংশ ঘরবাড়ি। গ্রামের বুক চিরে বয়ে চলা পানশালা নদী ফুঁসে উঠেছিল। সেই সময়ই নাকি বানের জলের সঙ্গে ভেসে এসেছিল কালো কুচকুচে বিশাল ওই প্রস্তরখন্ড। যা দেখে গ্রামবাসীরা ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। লাঠি দিয়ে পাথরের গায়ে আঘাত করতেই নাকি গা চুঁইয়ে রক্ত গড়াতে শুরু করে। সে রাতেই কয়েকজন গ্রামবাসী স্বপ্নাদেশ পান। স্বপ্নে শোনা যায় দ্বেববাণী – তোদের কোনও ভয় নেই, আমিই তোদের রক্ষা করব। সেই থেকে শনিদেবতার পুজো শুরু হয় গ্রামে। দেবতার প্রতি অন্ধ বিশ্বাস থেকে গ্রামের প্রতিটি বাড়ির জানলা, দরজায় কপাট ভেঙে দেওয়া হয়। বিশ্বাস জন্মায়, দরজা না থাকলেই দেবতা প্রবেশ করবেন ঘরে। নতুন করে গ্রামের নাম হয় ‘শনি-সিঙ্গনাপুর’। গ্রামের মাঝে তৈরি হয় বড় মন্দির। গ্রামের মাঝে বেদি তৈরি করে বসানো হয় সেই কালো পাথর। তখন থেকে ২৪ ঘন্টাই মন্দিরে পুজো হয়। তেল-ঘিয়ের প্রদীপ জ্বলে। মূর্তিকে স্নান করানো হয় তেল দিয়ে। ফি বছরের নির্দিষ্ট দিন মন্দির ধিরে মেলা বসে। পুণ্যার্থীদের ভিড় উপড়ে পড়ে। শনি-সিঙ্গনাপুর একদিকে যেমন তীর্থক্ষেত্র, অন্যদিকে জনপ্রিয় পযর্টন স্থল। গড়ে প্রতিদিন প্রায় চল্লিশ হাজার পুণ্যার্থী গ্রামে ভিড় জমান। প্রতি অমাবস্যা ও পূর্নিমায় ধুমধাম করে পূজো হয়। কেরলের শবরীমালা মন্দিরের মতো গ্রামের শনি মন্দিরেও একদা ঋতুমতী মহিলাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছি।

    বছর পাঁচেক আগে প্রায় তিনশো বছরের প্রথা ভেঙে জোর করে প্রবেশ করেছিলেন এক মহিলা। উপাসনা-স্থল ‘অপবিত্র’ করার দায়ে ওই মহিলাকে প্রবল ভৎসনার মুখে পড়তে হয়। মন্দিরের ‘পবিত্রতা’ ফিরিয়ে আনতে দুধ আর তেল দিয়ে ধোওয়া হয় মন্দির প্রাঙ্গণ। এর পরেই ‘ভূমাতা রণরঙ্গিনী ব্রিগেড’ একটি মহিলা সংগঠন এই প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে। মন্দির চত্বরে তারা প্রতিবাদ মিছিল করে। গ্রামে পাল্টা সংগঠিত হয় প্রতিবাদ মিছিল। মহিলা সংগঠনকে ঠেকাতে মাঠে নামে শিবসেনা ও হিন্দু সেনার মহিলা কর্মীরা। বিক্ষোভ, অবরোধ প্রায় রণক্ষেত্র হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। দীর্ঘ আন্দোলনের পর ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ বম্বে হাইকোর্টের নির্দেশে শনি মন্দিরে মহিলাদের প্রবেশাধিকারে ছাড়পত্র দেয় মহারাষ্ট্র সরকার।

No comments:

Post a Comment