Breaking

Sunday, January 13, 2019

শিল্প, গল্প দিয়ে ক্যানসার জয়ের মন্ত্র শেকালেন তৃণা

কেমোথেরাপির কটাক্ষ, ব্রোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্টের ধকলে শরীরটা ভেঙে গিয়েছে ঠিকই, তবে এসবের সিকিভাগও প্রভাব ফেলতে পারেনি মনে, বরং প্রত্যেকটা প্রতিকূলতা তাকে বজ্রকঠিন করে তুলেছে আরও। তিনি তৃণা লাহীড়ি। তামাম বিশ্ব যাকে কার্টুনিস্ট হিসাবে চেনে, প্রয়াত সেই চন্ডি লাহিড়ির মেয়ে। 

    খুব ছোট্ বয়সে হেনস্থার শিকার হওয়ার পর পেপার কাটিং শুরু। এরপর মাঝামাঝি সময়ে এসে ফের ধাক্কা ব্যক্তিগত জীবনে, সেখান থেকেই নিজের কাজ তথা নিজেকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার চেষ্টায় আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী এবং প্রতম কেমোর পর প্রথম গল্পের বই প্রকাশ। এভাবেই একটার পর একটা চড়াই-উতরাই তাকে বাঁচার উৎসাহ জুগিয়েছে।

‘বাবা আঁকতে পারে না’, এই দাবি করে বাবার কাছে আঁকতে বসার অনুরোধ স্পষ্ট নাকচ করে দিয়েছিল বছর চারের খুদে তৃণা, আঁকা শিখেছিল অন্যত্র। শিল্পীর মেয়ে হিসাবে কোনও বাড়তি সুবিধা নেবেন না বলেই শুরু করলেন অন্যভাবে পথ চলা, গানের স্কুলেও গেলেন। তবে আঁকা কিন্তু পিছু ছাড়েনি। প্রেসিডেন্সি কলেজে ইতিহাসে স্নাতক পর্যায়ের পর ভর্তি হন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এর মাঝেই কলেজের ক্লাস কামাই করে মজেছেন শিল্পের নেশায়। তার নেশা বলতে কাগজ কেটে বিভিন্ন প্রেক্ষাপট তুলে ধরা। ককনও ৩৭৭ ধারা খারিজ, কখনও আবার প্রকৃতির মায়া, কখনও ঠোঁট ফুলিয়ে বসে থাকা খুদে, কখনও আবার প্রেমের মায়াজাল। তার শিল্পে দেখা মেলে সবারেই। প্রথমে এঁকে নেনে, তারপর কেবল একটা পেপার কাটারের ছোঁয়া আর হাতের জাদুতেই প্রাণ পায় সে সব আঁকা। সেখানে রঙের কারিকুরি নেহাতেই সামান্য, কালো কাগজই প্রাধান্য পায়। নদীয়া, বীরভূম, মালদহ, মেদিনীপুরের গ্রামে গ্রামে ঘুরে ক্যানসারে আক্রান্ত ছোটদের আর্ট থেরাপি করান তিনি। 

ওরাও গল্প বলে, আর সেই গল্পই প্রাণ পায় তৃণা লাহিড়ির কাগজ আর পেপার কাটারের জাদুতে। তার কাজের বেশিরভাগ জুড়েই কেন প্রকুতি আর শিশু, এ প্রশ্নের উত্তরে এল, ‘যে কোনও কঠিন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয় শিশু আর প্রকৃতিকেই, তাই সেই গল্পই বারবার বেরিয়ে এসেছে আমার প্রতিটি আঁকায়। আসলে আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই একটা শিশু লুকিয়ে রয়েছে, তাকেই বের করে আনার চেষ্টা করি।’

গল্পকারের গল্প শেষ হয়নি এখনও, তার লেখা নিয়ে একধিক চলচ্চিত্র তৈরির কাজও শুরু হয়েছে ইতিমধ্যেই। গল্পের ক্ষেত্রে ‘ইউনাইটেড নেশনস অ্যাওয়ার্ড’-এর পালকও জুড়েছে তার মুকুটে। ইতিমধ্যেই বিদেশের একাধিক পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। শিক্ষকতা করেছেন আইআইএসি-র মতো একধিক প্রতিষ্ঠানে। 

বলার অপেক্ষা রাখে না, চন্ডি লাহিড়ির মেয়ে হওয়ার সুবাদে ছোট থেকেই শৈল্পিক পরিবেশে সত্তোর এবং আশির দশকে বড় হয়ে ওঠা। কখনও তাবড় তাবড় শিল্পীদেরে সান্নিধ্য পেয়েছেন, কখনও সে সময়ের নামজাদা রাজনীতিবিদদের। এদিকে বছর চারেক থেকেই দুরদর্শন ভবনে যাতায়াত শুরু করেছেন বাবার হাত ধরে। ওইচুকু বয়সেও পাপেট শো, ভয়েসওভার, মূকাভিনয় করেও অন্যান্য মহলে বেশ আদুরে হয়ে উঠেছিলেন খুদে তৃণা।

কলকাতর বেলগাছিয়ার রাজা মণীন্দ্র রোডের বাসভবনে, এক আলাপচারিতায় তৃনা জানালেন, ইউনেস্কো থেকে পাওয়া সম্মান কাযর্ত তাকে বিশ্বের দরবারে মুখ চিনিয়েছে। ইতিমধ্যেই জাপান সহ এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে তৃনার শিল্পের প্রদর্শন হয়ে গিয়েছে। বাদ পড়েনি পোল্যান্ড, ডেনমার্ক সহ ইউরোপিয় দেশগুলিও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় আবেদনে সাড়া দিয়ে ক্যানসার আক্রান্ত শিশুদের আঁকার পাঠ শিখিয়ে চলেছেন তিনি। 

তিনি বললেন, ‘কেমোথেরাপির যন্ত্রনা ভুলতে আমি শিল্পে ডুব দিয়েছিলেন। তাই আমি বুঝি ক্যানসারের যন্ত্রণা কতটা বয়াবহ। আর এই জন্যই ছোট্ ছোট্ শিশুদের নিয়ে আঁকা, কাগজ কাটিং শিল্পের মধ্যে ডুবিয়ে রাখি। যাতে ওরা যন্ত্রণাটা বুঝতে না পারে।’

কেমোথেরাপির যন্ত্রণা ভুলতে আমি শিল্পে ডুব দিয়েছিলাম। তাই আমি বুঝি ক্যানসারের যন্ত্রণা কতটা ভয়াবহ। আর এই জন্যই ছোট্ ছোট শিশুদের নিয়ে আঁকা, কাগজ কাটিং শিল্পের মধ্যে ডুবিয়ে রাখি। যাতে ওরা যন্ত্রণাটা বুঝতে না পারে।

No comments:

Post a Comment