Breaking

Wednesday, January 16, 2019

কোমাচ্ছন্ন ত্রিপুরার রোগীকে আলো দেখাল এসএসকেএম


যেকোনও রোগের সঙ্গে লড়াই করতে ওষুধই কি একমাত্র ভরসা? আর ওষুধে চিকিৎসা না হলেই বিকল্প হিসাবে অস্ত্রোপচারই কি অন্তিম ভরসা? 

    এটাই বোধহয় ছিল ভারতীয় চিকিৎসার চিত্র। কিন্তু সেই চিত্রের বদল আনলেন পশ্চিমবঙ্গের শেঠ সুখলাল করোনারি মেমোরিয়াল হাসপাতাল বা এসএসকেএম’-এর চিকিৎসকরা। ‘ওষুধ নয়, উত্তেজক চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমেও যে রোগীকে সুস্থ করা যায় তা হাতে কলমে করে দেখালাম আমরা’, জানালেন হাসপাতালের ফিজিক্যাল মেডিসিন রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের প্রধান রাজেশ পরমানিক।

গত ১৮ অক্টোবর ত্রিপুরার জয়নগর রোডের বাসিন্দা ৬৮ বছরের জনার্দন ভট্টার্চায হৃদরোগে আক্রান্ত হন। ত্রিপুরা রাজ্য সরকারের অবসরপ্রাপ্ত এই কর্মীর চিকিৎসা শুরু হয়েছিল ত্রিপুরা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। পরবর্তীকালে জনার্দনবাবুর পরিবারের তরফ থেকে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল ত্রিপুরা এবং কলকাতার দু’টি বেসরকারি হাসপাতালে। কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে হৃদপিন্ডে অস্ত্রোপচারের পরেই তিনি কোমায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। সেখান থেকে রোগীর চিকিৎসা শুরু হল দমদমের মিউনিসিপ্যাল হাসপাতালে। আর তারপর এসএসকেএম’এ।

যখন জনার্দনবাবুকে এসএসকেএম’এ ভর্তি করা হয় তখন কৃত্রিম ভাবে শ্বাস নেওয়া ছাড়া বাকি আর কোনও শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া চালু ছিল না। সেই সময় চেতনা মাপার সূচক বা গ্লাসগো কোমা স্কেল (জিপিএস)-এর সূচক ৩ এ নেমে গিয়েছিল। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘গভীর কোমা’ বলে চিহ্নিত করা হয়। একজন সাধানণ মানুষের ক্ষেত্রে যেখানে পিপিএস সূচক ১৫এর কাছাকাছি থাকে সেখানে জনার্দনবাবুর সূচক তিন। ‘আমাদের হারাবার কিছুই ছিল না, তবুও পরীক্ষা করার একটা সুযোগ আমাদের কাছে এসেছিল’ জানালেন রাজেশ। সৌভাগ্য বলতে রোগীর স্নায়ু পুরোপুরি অকেজো হলেও তার লিভার, কিডনি সহ যাবতীয় তন্ত্রের কোনও ক্ষতি হয়নি। আর এই বিষয়কে হাতিয়ার করে চিকিৎসার পরবর্তী পদক্ষেপ বিচার করলেন এসএসকেএম’এর চিকিৎসক দলটি। 

তখনই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, ওষুধ নয়, বিকল্প পদ্ধতির মাধ্যমে জনার্দনবাবুর স্নায়ুকে ফের জাগিয়ে তুলতে হবে। একজন সুস্থ মানুষের স্নায়ুবিক উত্তেজনাকে নিয়ন্ত্রণ করে থ্যালামাস। চিকিৎসকদের লক্ষ্য ছিল, পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে একসঙ্গে উত্তেজিত করে থ্যালামাসকে আবার সচল করে তোলা। আর এই পদ্ধতি অবলম্বন করতে গিয়ে চিকিৎকদের জনার্দনবাবুর পারিবারিক এবং অতীতের ইতিহাস ঘাঁটতে হয়েছে।

সেই অনুসন্ধান পর্বে তারা জেনেছেন, বাড়িতে গোলাপ, রজনীগন্ধার চাষ নিজে হাতে করতেন তিনি। আর মাঝেমধ্যেই নস্যিতে সুখটান দিতেন। ভাতের থালায় নুন ছিল তার আবশ্যিক। অবসর পেলেই রবীন্দ্রসঙ্গীতে ডুব দিতেন। প্রক্তন সরকারি কর্মী। এই সব ছোট ছোট তথ্যকে একত্রিত করে ‘স্টিমূল্যান্ট থেরাপি’ বা উত্তেজক চিকিৎসা শুরু হল তার।

নস্যির ডিবে থেকে এক চিলতে নস্যি নাকে ঠেকাতেই কোমায় আচ্ছন্ন জনার্দনবাবুর হঠাৎই নড়েচড়ে উঠলেন। প্রথম দিনের চিকিৎসাতেই যে সাফল্য মিলেছে তা বুঝলেন কার্ডিয়ো থোরাসিক ভাসকুলার বিভাগের প্রধান সন্দীপ কুমার কর। গোলাপ, রজনীগন্ধার গন্ধ জাগিয়ে তুলছিল তার ঘ্রানশক্তিকে। কিন্তু রবীন্দ্রসঙ্গীত সেইভাবে জনার্দনবাবুর শ্রবণ ইন্দ্রিয়কে সজাগ করতে পারছিল না। তাই সন্দীপবাবু রবীন্দ্রসঙ্গীতের পাশাপাশি দরবারি সঙ্গীতকে আনলেন জনার্দনবাবুর চিকিৎসার জন্য। 

আর তাতেই ফল মিলল। প্রায় তিন মাস ধরে যে রোগী কোময় আচ্ছন্ন ছিলেন সেই রোগী এখন স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে পারছেন। চোখ খুলে তাকাতে পারছেন। ইতিমধ্যেই তার ক্ষেত্রে ফিজিও থেরাপির চিকিৎসাও শুরু হয়ে গিয়েছে। গ্লাসগো সূচকও ১২ দাঁগকে ছুঁয়ে দিয়েছে। নতুন জীবন যে জনার্দনবাবু পেয়েছেন তা স্বীকার করে নিয়েছেন তার ভাইজি পঞ্চতপা ভট্টার্চায। তিনি বলেছেন, ‘আমরা তো ভাবতেই পারিনি জেঠু আবার চোখ খুলে তাকাতে পারবেন। আমি এসএসকেএম-এর চিকিৎসায় তাজ্জব হয়ে গিয়েছ।’ কিন্তু কী এমন ঘটল যেখানে ওষুধ সাড়া দেয়নি, অথচ সেখানে বিকল্প উত্তেজক পদার্থ সাড়া দিল? এই প্রসঙ্গে সন্দীপবাবু জানিয়েছেন, এটাই উত্তেজক চিকিৎসার বৈশিষ্ট্য। স্নায়ুতন্ত্রের মধ্য দিয়ে যে পথে উত্তেজনা সরবরাহ হয় সেই পথ বন্ধ হলে তার বিকল্প পথ খুলে দেয় উত্তেজক চিকিৎসা। পশ্চিমী দুনিয়ায় এই চিকিৎসায় অটিজিম রোগেও সুফল মিলেছিল। এই প্রথম ভারতে পরীক্ষামূলকভাবে এই চিকিৎসায় সাড়া মিলল অভাবনীয়।

ভগবান নন – তবুও পুজিত হন ভগবান রূপেই। অনেক অসাধ্য সাধনের সত্যি ঘটনাগুলি আজও জীবন্ত। তবুও আক্রান্ত হতে হয় ব্যতিক্রমী মৃত্যু ঠেকাতে না পেরে। সেই সব দেবদূত চিকিৎসকদের নিয়েই ধারাবাহিক খোঁজ খবর।

No comments:

Post a Comment