Breaking

Monday, January 7, 2019

2000 গ্রাহক নিয়ে বিশ্বের ১৩ বছরের ব্যাঙ্কার


বয়স এখনও ১৩ হয়নি। এখন তার বাবা-মায়ের কাছে নিত্য-নতুন জিনিসের জন্য আবদার করার বয়স। অথচ এই কচি বয়সেই কোট-প্যান্টের কর্পোরেট লুকে বড়দের সঙ্গে ব্যাবসা নিয়ে গুরুগম্ভীর আলোচনায় ব্যস্ত সে। 

    সিনেমা নয়, বাস্তব। মাত্র তেরো বছর বয়সেই পেরুর এই কিশোর আস্ত একটি ব্যাঙ্কের কর্ণধার। মিহি গলার স্বর, অথচ কথায়-বার্তায় যেন বড়দের ডার্বিং ঝকঝকে স্যুট বুটের এই ব্যাঙ্ক কর্তা শুধু নিজের দেশই নয়, চমকে দিয়েছে গোটা দুনিয়াকে। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ঈর্ষণীয় পুরস্কারও নিজের ঝুলিতে ভরে ফেলেছে সে।

    পেরুর এই বিস্ময় বালকের নাম জোসে অ্যাডলফ কুইসোকালা কনদোরি। বয়স যকন মোটে সাত, তকনই আস্ত একটি ব্যাঙ্ক খলে ফেলে সে। বর্তমানে তার ব্যাঙ্কে গ্রাহকের সংখ্যা ২০০০। কর্মচারী ৮ জন। সকলে যে তার মতো খুদে কর্মী তা নয়, অভিজ্ঞতা সম্পন্ন দক্ষ ব্যক্তিকেও সে চাকরি দিয়েছে। তবে তার ব্যাঙ্কের গ্রাহকের সিংহভাগ গ্রাহক খুদে। টাকা জমা দেওয়া, সময়ততো ব্যাঙ্ক কর্তার কড়া নির্দেশ, অভিভাবকদের সাহায্যে নয়, ছোটে থেকেই স্বনির্ভর হতে হবে তার সময়বসিদের। 

    পেরুর অ্যারেকুইপা শহরে এই কিশোর পরিচালিত ব্যাঙ্কের নাম ‘বার্টসেলানা স্টুডেন্ট ব্যাঙ্ক’। ২০১২ সাল থেকে পথ চলতে শুরু করে এই ব্যাঙ্ক। নিজের দেশে জনপ্রিয়তা অর্জনের পর কিশোর জোসে অ্যাডলফের নাম ছড়িয়ে পড়েছে গোটা বিশ্ব জুড়ে। হ্যাঁ, বিশ্বে এটাই প্রথম ব্যাঙ্ক যার কর্ণধার একজন খুদে ব্যাঙ্কার। সাফল্যের প্রশ্নে এই মুহুর্তে ইউক্রেন, কলম্বিয়া, আমেরিকা, সুইডেনের যে কোনও ট্যালেন্ট বিজেতা খুদেকে ধরাশায়ী করে দিয়েছে জোসে। তাকে দেখে প্রাণিত হয়ে নিজের দেশেও এমন ‘কিডস ব্যাঙ্ক’ খুলতে আগ্রহ দেখিয়েছে একধিক দেশ।

এই বয়সে যকন স্কুলের বইয়ের ভাবে ক্লান্ত হয়ে যাওয়ার অবস্থা তার সহপাঠীদের, তখন সে কী ভাবে ব্যাঙ্ক খোলার কতা ভাবল? সাংবাদিকদের ঝাঁঝালো প্রশ্নের উত্তরে শান্ত গলায় জোসে অ্যাডলফ বলে, ‘ছোট বয়সের বেহিসাবি খরচ কমিয়ে সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতেই ব্যাঙ্ক তৈরির ভাবনা আসে মাথায়। খেলনা, চকোলেট, ভিডিও গেমস ইত্যাদির পিছনে গুচ্ছ গুচ্ছ টাকা খরচ না করে বরং সেই টাকা জমিয়ে রাখলে যে ভবিষ্যতে অনেক কাজ দেবে, এই ব্যাঙ্ক তৈরির মাধ্যমে আমি এটাই বলতে চেয়েছি।’ জোসের কথায়, ‘আমার বয়স তখন সাত। ব্যাঙ্ক তৈরি করব বলে স্কুলে জানাই। সকলেই হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। শিক্ষকরা ভেবিছিলেন, হয়তো শিশু মনের এ এক নতুন খেয়াল। তবে প্রিন্সিপ্যাল সাহায্য করেছিলেন। এরপর আমাকে আর পিছনে তাকাতে হয়নি। সেই থেকে এগিয়ে চলেছি।’ 

বার্টসেলানাস্টুডেন্ট ব্যাঙ্ক কিন্তু নিছক টাকা জমানো এবং ঋণ নেওয়ার ব্যাঙ্ক নয়। এই ব্যাঙ্কের অন্য একটি উদ্দেশ্য-ও রয়েছে। বলতে গেলে, সেটাই মুখ্য উদ্দেশ্য। তা হল, পরিবেশকে প্লাস্টিক দূষণের হাত থেকে বাঁচানো। আর সেখান থেকেই ব্যাঙ্কের মূল আয়। কী রকম? নিজের শহর ও চারপাশে পড়ে থাকা প্লাস্টিকের আবর্জনা গ্রাহকেরা ব্যাঙ্কে এসে জমা দেবে। সেই প্লাস্টিক ব্যাঙ্কের তরফ থেকে বিক্রি করা হবে বিভিন্ন কাগজকল ও সার কারখানায়। সেখানে এই বর্জ্য থেকে তৈরি হবে টয়লেট পেপার, জৈব সার। জোসের কথায়, ‘এক-একজন গ্রাহক কম করে ৫ কিলো প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যাঙ্কে জমা করে। সব আবর্জনা একসঙ্গে আমরা বিক্রি করি। সেকান থেকে যা উপার্জন হয়, সেই অর্থ আনুপাতিক হারে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে জমা হয়। বর্জ্য জমা করার লক্ষ্যমাত্রায় পৌছলে গ্রাহকেরা তাদের প্রয়োজনীয় আমানত তুলে নিতে পারে। অথবা সেই টাকা ফিক্সড ডিপোজিট করতে পারে। এমনকী সেখান থেকে ঋণও নিতে পারে।’ জোসে জানিয়েছে, ২০১২-১৩ অর্থবর্ষে তার ব্যাঙ্কে সবচেয়ে বেশি আয় হয়েছিল। গ্রাহকেরা সকলে মিলে প্রায় ১ টন পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য জমা করেছিল। সেই বর্জ্য বিক্রি করে জোসের স্কুলেরই ২০০ জন ছাত্রছাএীর সেভিংস অ্যাকাউন্টের খাতা তৈরি করেছিল ব্যাঙ্ক।

কো-অপারেটিভ ইকো ব্যাঙ্কের এমন অভিনব ভাবনার জন্য ২০১৮ সালে সুইডেনের স্টকহোমে জোসের ব্যাঙ্ক-কে ‘টিলড্রেনস ক্লাইমেট’ পুরস্কার দেওয়া হয়। সঙ্গে সাড়ে পাঁচ ডলারের চেক। জোসের প্রতিক্রিয়া? সে বলেছে, ‘ওই অ্যাওয়ার্ড পেয়ে আমি খুশি হয়েছিলাম। তবে আমার মূল কথা হল, যে কোনও কাজে শিশুদেরই এগিয়ে আসতে হবে। কারণ তারাই ভবিষ্যৎ । পরিবেশকে ধূষণমুক্ত করার চ্যালেঞ্জটা তাই শিশুদেরই নিতে হবে।’

এখানেই শেষ নয়। খুদে অর্থনীতিবিদ হিসাবে নোবেলের জন্যেও তার নাম পাঠানোর চিন্তাভাবনা শুরু করেছে পেরু সরকার। জোসের পাশে দাঁড়িয়েছে আমেরিকার ডিজনি চ্যানেল।

No comments:

Post a Comment