Breaking

Tuesday, January 1, 2019

আজও হাঁটেন চার হাত-পায়ে বিবর্তনবাদকে চ্যালেঞ্জ তুরস্ক পরিবারের


হোমোসেপিয়ান। মানব বিবর্তনের অন্যতম অধ্যায়। যখন চার হাত-পা থেকে দু’পায়ে ঋজু হয়ে উঠে দাঁড়াল মানুষ। সভ্যতার ইতিহাস বলছে, তা ৩০ থেকে ৪০ লক্ষ বছর আগের ঘটনা। সেই থেকে সমগ্র মানব জাতি আজও সে ভাবেই দাঁড়ায় এবং হেঁটেচলে বেড়ায় বলেই সকলের জানা।


    এদিকে সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, তুরস্কের দক্ষিণাংশে এমন একটি প্রদেশ বয়েছে, সেখানকার দুর্গম অঞ্চলের একটি গ্রামের মানুষ (আদতে বড় একান্নবর্তী পরিবার) এখনও ঋজু হয়ে দাড়াতে পারে না। এদের সকলের বয়স ১৮ থেকে ৪৪ বছরের মধ্যে। এদের পদবি ‘উলাস’। প্রদেশটির নাম ‘হাতে’। ওই গ্রামের মানুষ আজও চার হাত-পায়ে বন্য জন্তুর মতো চলাফেরা করে। যদিও তাদের এই চলনে হাত ও পায়ের চলন সমান্তরাল থাকে না। বিষয়টি প্রথম বিজ্ঞানীদের নজরে আসে ২০০৫ সালে। কেন এমন? সোজা হয়ে হাঁটতে তাদের অসুবিধা কোথায়? যদিও এরা অতি কষ্টে সোজা হয়ে শুধুমাত্র দাঁড়াতে পারলেও তার স্থায়িত্ব খুব কম। পায়ের পাতা আর হাতের তালুতে ভর দিয়ে এরা হাঁটে। তবে মুখটি থাকে সামনের দিকে। আবার তারা উবু হয়ে হাঁটতে চলতে শুরু করেন। তারা কি ডারউইনের বিবর্তনবাদ তত্ত্বকে অস্বীকার করছে? বিষয়টি জানার পর অনুসন্ধান শুরু করেন তুরস্কেরই একদল বিজ্ঞানী। পরে তা বিশ্বের অন্যান্য বিজ্ঞানীদেরও নজরে পড়ে। গবেষণায় যোগ দেন টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল মার্কিন বিজ্ঞানী। শুরু হয় সবিস্তার গবেষনা। সম্প্রতি তাদের গবেষণাটি বিজ্ঞান বিষয়ক ‘প্লজ ওয়ান’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম দিকে বিজ্ঞানীদের একাংশ জানিয়েছিলেন, তুরস্কের ওই গ্রামের মানুষেরা আধুনিক মানব (হোমোসেপিয়ান) এবং প্রাগৈতিহাসিক (লিয়েনডার্থল) মানবের মাঝামাঝি পর্যায়ে রয়েছেন। কিন্তু ডারউইনের বিবর্তনবাদের তত্ত্ব বলে, এমনটা হওয়ার কথাই নয়। কারণ মানুষ এই মধ্যবর্তী পর্যায় লক্ষ লক্ষ বছর আগেই পেরিয়ে এসেছে। তবে কি ওই গ্রামবাসীদের কাছে বিবর্তনের সূত্র বিপরীত দিকে হাঁটছে?

    সম্প্রতি ‘সিক্সটি মিনিটস অস্ট্রেলিয়া’ নামে টিভির একটি অনুষ্ঠানে ওই মানুষদের চার হাত-পায়ে হাঁটার কারণ তুলে ধরা হয়। প্রচুর তথ্য প্রমান সংগ্রহ করে বিজ্ঞানীরা সর্বশেষ জানিয়েছেন, এটি এক ধরনের স্বতন্ত্র তথা বিকৃত শারীরিক সমস্যা। যেহেতু ওই গ্রামের বাসিন্দারা সকলে মূলত নির্দিষ্ট একটি বংশের সন্তান, তাই জিনঘটিত কারণে কেউই এই বিকৃতির বাইরে বেরোতে পারেননি। ওই অনুষ্ঠানে দেখা যায়, তুরস্কের ওই প্রত্যন্ত এলাকার নিবাসী এক ব্যক্তি, নাম রিজিত ইনলেস ও তার স্ত্রীর মোট 18 টি সন্তান ছিল। এদের কেউই সোজা হয়ে হাঁটতে পারতেন না। পরবর্তী কালে এদের আবার সন্তান হয়। তাদেরও একই দশা, সকলেই চার হাত-পায়ে জন্তুর মতো হাঁটেন। ঠিক কী ধরনের সমস্যার ফলে তারা এমন করে হাঁটেন, তা জানতে বিজ্ঞানীরা তাদের মস্তিষ্কে অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে স্ক্যান করেন। এতে দেখা যায়, তাদের মস্তিষ্কের সেরেবেলাম নামে একটি অংশে জটিলতা রয়েছে। তবে শুধুমাত্র এই সমস্যার জেরেই তারা ওভাবে হাঁটাচলা করেন কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনও নিশ্চিত নন। কারণ গবেষকরা দেখেছেন, পৃথিবীর অনেক জায়গাতেই এমন একই সমস্যা নিয়ে বহু মানুষ দু’পায়ের উপর ভর দিয়েই হেঁটে বেড়ান। তাই বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই সমস্যার সঙ্গে তিলেছে জিনগত কিছু সমস্যা। সেই কারণেই তুরষ্কের ‍ওই গ্রামটির মানুষ সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন না।


    তুরস্কের ওই এলাকাটি প্রত্যন্ত এবং দুর্গম। ফলে চিকিৎসা পরিষেবা সেখানে এখনও প্রায় নেই বললেই চলে। তাই চিকিৎসার মাধ্যমে ছোট বয়স থেকে তাদের অভিভাবকেরা সোজা হয়ে হাঁটতে শেখানোর চেষ্টা করেছিলেন কি না, তাও জানা যায়নি।বিজ্ঞানীরা অবশ্য সম্প্রতি ফিজিওথেরাপি ও অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতি দিয়ে ওই মানুষগুলিকে সঠিক ভাবে হাঁটা শেখানোর চেষ্টা শুরু করেছেন। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, গ্রামের বয়স্ক যারা, তাদের ছোট থেকে ও ভাবে হাঁটার ফলে শরীরে স্থায়ী কিছু পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। ফলে তাদের নতুন করে সোজা হয়ে দাঁড় করানো খুব কঠিন। কারণ এখন তারা চার হাতে-পায়ে হাঁটতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তাদের সন্তানদেরও একই সমস্যা ছিল। তবে তাদের বয়স কম হওয়ায় সঠিক প্রশিক্ষণ ও চিকিৎসার মাধ্যমে ধীরে ধীরে সোজা হলেও এ কাজে সাফল্য পাওয়া যাবে বলে বিজ্ঞানীরা আসাবাদী।

No comments:

Post a Comment