Breaking

Tuesday, January 22, 2019

এক শতাংশ ধনীর হাতে ভারতের অর্ধেক সম্পত্তি


৫০ শতাংশ ভারতবাসীর হাতে যে সম্পত্তি রয়েছে, দেশের মাত্র ৯ শাতাংশ ধনীর হাতেই রয়েছে সমপরিমাণ সম্পদ। চমকে উঠলেন? তা হলে আরও জানুন, কেন্দ্র ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য মিলিয়ে চিকৎসা স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা খাতে বার্ষিক বরাদ্দ আয়ের যা অর্থ, রিলায়েন্স কর্ণধার মুকেশ আম্বানির একার আয় তার চেয়ে বেশি! দেশের ১ শতাংশ ধনীর এক দিনের আয় ২২০০ কোটি টাকা। 

    চোখ কপালে উঠে যাওয়ার মতো এমনই পরিসংখ্যান উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা অক্সফ্যামের সাম্প্রতিক সমীক্ষায় মোদ্দা কথা হল, ভারতের ধনীরা আরও ধনী হচ্ছেন। অথচ হাল ফিরছে না গরিবদের। উল্টে আরও শোচনীয় হচ্ছে তাদের অবস্থা। ‘আচ্ছে দিন’-এর স্বপ্ন ফেরি করে ক্ষমতায় আসা নরেন্দ্র মোদি সরকারের কাছে যা বাস্তবিকই উদ্বেগের বিষয়। কারণ ফের লোকসভা ভোটের মুখে সরকার। আর এই সময়ের মধ্যেই অক্সফ্যামের মতো সংস্থার প্রকাশিত এই রিপোর্ট মোদি সরকারকে কিছুটা বেকায়দায় ফেলতে পারে বলেই মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল।

    ভারতের ধনী ও দরিদ্রের আয়ের ব্যবধান কএই নিয়েই সমীক্ষা করেছিল অক্সফ্যাম। তারা অবশ্য গোটা পৃথিবীর ধনী-দরিদ্রের আয়ের বৈষম্য জানতে সমীক্ষাটি চালিয়েছিল। তাতে তো ধরা পড়েছে আরও উদ্বেগের ‘ছবি’। জানানো হয়েছে, সারা পৃথিবীতে ৫০ শতাংশেরও বেশি গরিব মানুষের হাতে যা সম্পত্তি রয়েছে, বিশ্বের প্রথম সারির ২৬ জন মানুষের কাছে রয়েছে তার চেয়ে বেশি সম্পদ। সমীক্ষা জানাচ্ছে, ২০১৮ সালে দরিদ্রসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ছিল ৩৮০ কোটি। ভাবলে সত্যিই চমকে উঠতে হয় যে, এই ৩৮০ কোটি মানুষের হাতে থাকা সম্পত্তি ধনীতম মাত্র ২৬ জন মানুষের চেয়েও কম। শুধু ভারতে বলে নয়, সবুজ এই গ্রহটিতেই ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য এক চরম আকার নিয়েছে। সমীক্ষা বলছে, বিশ্বের ১ শতাংশ ধনীর আয় গত এক বছরে যতটা বেড়েছে, তা সম্পত্তিকর হিসাবে জমা হলে অঙ্কটি হবে ৪১,৮০০ কোটি ডলার। যে পরিমান অর্থ দিয়ে পৃথিবীর প্রতিটি শিশুকে বছরে স্কুলে পাঠানো যায়, স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়া যায়। দারিদ্রের কারনে ফি বছর বিশ্বে ৩০ লক্ষ শিশু মারা যায়। 

    আসা যাক ভারতের দিকে। অক্সফ্যামের রিপোর্ট বলছে, ২০১৮ সালে ১ শতাংশ ধনীর প্রতিদিনের আয় বেড়ে হয়েছে ২২০০ কোটি টাকা। দেশে কোটিপতিদের সম্পত্তি বেড়েছে ৩৯ শতাংশ। অন্যদিকে আয় সূচকের নিচে থাকা দেশের অর্ধেক জনসংখ্যার আয় বেডেছে মাত্র ৩ শতাংশ। বস্তুত, ভারতের অর্থনীতিতে ধনী-দরিদ্রের আয়ের মধ্যে কাযর্ত যে আলোকবর্ষ দূরত্ব, তাকেই বেআব্রু করে দিয়েছে এই রিপোর্ট। ভারতের মাত্র ১ শতাংশের হাতেই রয়েছে প্রায় ৫২ শতাংশ জাতীয় সম্পদ। আবার ধনীর হাতেই রয়েছে দেশের মোট সম্পদের ৭৭.৪ শতাংশ। যেকানে অর্থনীতি সূচকের নীচের দিকে থাকা ৬০ শতাংশ জনসংখ্যার হাতে রয়েছে মাত্র ৪.৫ শতাংশ জাতীয় সম্পদ। পাশাপাশি দেশের মাত্র ৯ জন ধনীর সম্পদের পরিমানই দেশের ৫০ শতাংশ জনসংখ্যার মোট সম্পদের সমান। অর্থনীতির এই বৈষম্য স্পষ্ট করে বোঝাতে ভারতের ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসাবে মুকেশ আম্বানির আয়ে হিসাব। অক্সফ্যাম তাদের রিপোর্টে উল্লেখ করেছে, কেন্দ্র ও সব কটি রাজ্য মিলিয়ে চিকিৎসা, স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা খাতের মোট ব্যয় বরাদ্দ ২ কোটি ৮ লক্ষ ১৬৬ কোটি টাকা। সেখানে মুকেশ আম্বানির সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ২ কোটি ৮০ লক্ষ কোটি টাকা। আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, যদি ভারতের ১ শতাংশ ধনী ব্যক্তি তাদের সম্পত্তির উপর মাত্র ০.৫ শতাংশ অতিরিক্ত কর দেন, তা হলে দেশের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বরাদ্দ ৫০ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব। আবার গোটা বিশ্বের বৈষম্যের চিত্রটি স্পষ্ট করতে উদাহরণ দেওয়া হয়েছে অ্যামাজনের ২০১৮ সালে সংস্থার প্রতিষ্ঠতা জেফ রেজোসের আয় বেড়ে হয়েছে ১১ হাজার ২০০ কোটি মার্কিন ডলার। বেজোসের আয়ের মাত্র ১ শতাংশের সমান ইথিওপিয়ার স্বাস্থ্য খাতের মোট বরাদ্দ। যে দেশে জনসংখ্যা পায় ১১ কোটি। এই বিষয়টি নিয়েই উৎকন্ঠা প্রকাশ করেছে অক্সফ্যাম। সংস্থার আর্ন্তজাতিক সম্পর্কের র্কাযর্নিবাহী অধিকর্তা সম্পর্কের বক্তব্য, ‘ভারতের এই আর্থিক বৈষম্য তীব্র উদ্বেগের।’ তার কথায়, ‘ভারতের ১ শতাংশ ধনী ব্যক্তির সঙ্গে বাকি জনসংখ্যার আয় এবং সম্পত্তির পরিমাণের ব্যবধান কমাতে না পারলে এবং ভারসাম্য আনতে না পারলে গোটা অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোটাই ভেঙে পড়বে।’ অক্সফ্যামের সিইও অমিতাভ বেহার বলেছেন, ‘এই সমীক্ষা থেকেই স্পষ্ট, ধনী-গরিবের পার্থক্য কতটা! আরও ভেঙে বললে, আর্থিক বৈষম্য কতটা প্রকট। সরকার এক দিকে চিকিৎসা, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ কমাচ্ছে, অন্য দিকে ধনীদের কর কমিয়ে বা ছাড় দিয়ে বৈষম্য আরও বাড়িয়ে তুলছে। আর সেই বোঝা চাপছে গরিব, নিম্ন ও মধ্যবিত্তের উপর।’ তার মতে, অর্থনীতির এই বৈষম্যের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে মহিলা ও শিশুদের উপর। 

    ভারতের পাশাপাশি সারা বিশ্বে ধনীদের আয় বেড়ে হয়েছে ২৫০০ কোটি টাকা। সম্পত্তি বৃদ্ধির হার ১২ শতাংশ। অন্যদিকে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশেরও বেশি যে গরিব মানুষ, উল্টে তাদের আয় কমেছে ১১ শতাংশ। 

এক নজরে সম্পত্তির আয়
v ভারতের ১ শতাংশ ধনীর হাতে রয়েছে ৫১.৫৩ শতাংশ জাতীয় সম্পদ।
v ১০ শতাংশ ধনীর হাতে রয়েছে জাতীয় সম্পদের ৭৭.৪ শতাংশ।
v ৬০ শতাংশ জনসংখ্যার হাতে রয়েছে জাতীয় সম্পদের মাত্র ৪.৮ শতাংশ।
v ৯ জন ধনীর সম্পত্তির পরিমাণ দেশের মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশের সম্পদের সমান।
v কেন্দ্র ও সব কটি রাজ্য মিলিয়ে চিকিৎসা, স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা খাতে মোট ব্যয় ২,০৮,১৬৬ কোটি টাকা। মুকেশ আম্বানির একার সম্পত্তির অঙ্ক ২,৮০ লক্ষ কোটি টাকা।
v ২০১৮ সালে ভারতের ১ শতাংশ ধনীর দৈনিক আয় বেড়ে হয়েছে ২২০০ কোটি টাকা। বিশ্বে ধনীতম অংশের আয় বেড়ে হয়েছে ২৫০০ কোটি টাকা।

No comments:

Post a Comment