Breaking

Monday, November 26, 2018

আন্দামানের হিংস্র সেন্টিনেলিজরা আজও জানে না মুদ্রা ও আগুনের ব্যবহার


স্বাধীনতার পর সাতটি দশক কেটে গিয়েছে। কোথা থেকে দেশ কোথায় এগিয়ে গিয়েছে। প্রত্যন্ত গ্রামেও পৌঁছে গিয়েছে মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট। মঙ্গলাভিযানের পর চন্দ্রাভিযানের তোড়জোড় করছেন দেশের মহাকাশ বিজ্ঞানীরা। 


    অথচ আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের রাজধানী পোর্ট ব্লেয়ার থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত নর্থ সেন্টিনেল দ্বীপের উপজাতিদের জীবনে সামান্যতম পরিবর্তন হয়নি। আজও তারা বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন। সভ্যতার কোনও ছোঁয়া লাগেনি তাদের যাপনে। ইচ্ছাকৃত ভাবে তারা নিজেদের সমাজ ও সভ্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। বহিরাগতদের রুখতে নৃশংস পদক্ষেপ করতে তারা পিছপা হয় না। কোনও মুদ্রাও ব্যবহার করে না সেন্টিনেলিজরা। এই সংরক্ষিত উপজাতির বিরুদ্ধে মামলাও করা যায় না। কিছুদিন আগে পযর্ন্ত তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন বা তাদের এলাকায় প্রবেশকে বেআইনি বলে গন্য করা হতো ভিডিও ক্যামেরায় তাদের গতিবিধি রেকর্ড করাও নিষিদ্ধ। ২০১৭ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে জানানো হয়, সেন্টিনেলিজরা আদিম অধিবাসী। তাদের নিয়ে কোনও রকম ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করা যাবে না। সকলে বলে, এই আদিম উপজাতিরা বন্য পশুর মতোই হিংস্র। বহু চেষ্টা করেও নাকি তাদের বাগে আনা সম্ভব হয়নি। দ্বীপের বাইরের ‘সভ্য’ লোকজনদের তারা নিজেদের চরম শত্রু মনে করে। এই আদিবাসীদের বল হয় ‘সেন্টিনেলিজ’। নৃতাত্ত্বিকদের বক্তব্য, এরাই বিশ্বের শেষ হিংস্র জনজাতি। এই উপজাতি গোষ্ঠীর জীবনধারা ঠিক কেমন, সে বিষয়ে আজও পুরোপুরি স্বচ্ছ ধারণা নেই কারও। বেশিটাই পরিপার্শ্বিক তথ্য-প্রমাণের উপর নির্ভর করে বিশেষজ্ঞদের তৈরি করা। এর প্রধান কারণ, নর্থ সেন্টিলেজ দ্বীপের দুর্গম প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং সেই সঙ্গে সেখানকার মূলবাসী উপজাতিদের হিংস্র আচরণ। 


    দ্বীপটি মূলত দক্ষিণ আন্দামান এলাকায়। দক্ষিণ আন্দামানের ওয়ানদূর শহর থেকে ৩৬ কিলোমিটার পশ্চিমে উত্তর সেন্টিলেন দ্বীপ। পোর্ট ব্লেয়ার থেকে এর দূরত্ব ৫০ কিলোমিটার দূরে রয়েছে এই দ্বীপের অন্য একটি অংশ, দক্ষিণ সেন্টিনেল। উত্তর সেন্টিনেলের চারদিকে ঘিরে রয়েছে প্রবাল প্রাচীর। ৭২ বর্গ কিলোমিটার (১৮০০০ একর) বিস্তৃত এই দ্বীপ বরাবর রহস্যে ঘেরা। এখানকার জনজাতিদের সংখ্যা সম্পর্কেও খুব স্পষ্ট তথ্য নেই। ২০১১ সালের আদমসুমারি রিপোর্ট বলছে, উত্তর সেন্টিনেলে সেন্টিনেলিজদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৪০ জন। তবে এ তথ্য যে অভ্রান্ত, তেমন দাবি করেন কেউ। একদা জানা গিয়েছিল, ওই দ্বীপে পুরুষ, মহিলা ও শিশু মিলে ৪০০ আদিবাসীর বাস। ২০০৪ সালে আন্দামান-নিকোবর দ্বীপে ভয়ঙ্কর সুনামির পর থেকে সেন্টিনেল দ্বীপের প্রকৃতিক পরিবেশ আগের চেয়ে অনেক রুক্ষ হয়ে ওঠে। সুনামিতে বহু সেন্টিনেলিজ আদিবাসী প্রান হারায় বলে নৃতত্ত্ববিদরা জানিয়েছেন। সুনামির পর থেকে তাদের খাবারেও টান পড়তে শুরু করে। সর্বোপরি রয়েছে দুরারোগ্য রোগের প্রকোপ। সব মিলিয়ে সেন্টিনিলেজ জনজাতিরা ক্রমশ বিলুপ্তির পথে। তবুও বহির্বিশ্ব থেকে তারা নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে রাখতেই ভালবাসে। তারা চায় না আধুনিক পরিষেবা, চিকিৎসা ব্যবস্থা, খাদ্য-বাসস্থান।

    হিংস্রতা তাদের রক্তে। প্রাচীন এই উপজাতির একমাত্র পেশা শিকার। সভ্য মানুষের ছোঁয়া তাদের একেবারেই না-পছন্দ। নিজেদের গন্ডি এদের একমাত্র প্রিয় জায়গা। তারা ভেলা নিয়ে সমুদ্রে মাছ শিকার করে বর্শা জাতীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে। সে সবই জঙ্গল কেটে বানানো। বহিরাগতদের উপর আক্রমণের জন্য বরাবর এরা কুখ্যাত। সরকারি তথ্য বলছে, প্রায় ৬০ হাজার বছর ধরে সেন্টিনেলিজরা এই দ্বীপের বাসিন্দা। এরা আজও আগওনের ব্যবহার জানে না। শেখেনি চাষবাস। এরা একে অপরের সঙ্গে যে ভাষায় কথা বলে, সেটি তাদের কাছাকাছি বাস করা উপজাতিদের পক্ষে বোধগম্য নয়। মনে করা হয়, এই আদিম মানুষরা আফ্রিকা থেকে এই দ্বীপে চলে এসেছিল। সেন্টিনেলিজদের সঙ্গে প্রথম সভ্য মানুষের সাক্ষাৎ হয ১৮৮০ সালে। ব্রিটিশ নৃতত্ত্ববিদ এম ভি পোর্টম্যানের নেতৃত্বে একটি দল ্ওই দ্বপে গিয়ে উপজাতিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার চেষ্টা করে। উপজাতিদের এক প্রৌঢ় দম্পতি এবং চার বছরের একটি শিশুকে তুলে নিয়ে আসেন সমীক্ষা চালানোর জন্য। তাদের নতুন জামাকাপড় ও খাবার দেওয়া হয়। কথা বলানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু আধুনিক সভ্যতা মানতে না পেরে কয়েক মাসের মধ্যে কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে তাদের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনার পর সভ্য মানুষের প্রতি সেন্টিনেলিজদের আক্রোশ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। বহিরাগত দেখলেই তারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। 


    ১৯৭৫ সালে ন্যাশানাল জিওগ্রাফির একজন চিত্রগ্রাহী তথ্যচিত্র বানানোর জন্য সেন্টিনেল দ্বীপে গিয়েছিল। উপজাতিদের বিষ মাখানো তিরের ঘায়ে তিনি মারাত্মক রকমের জখম হন। ১৯৯১ সালে ভারত সরকার ফের সেন্টিনেলিজদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করে। ওই বছরের ৪ জানুয়ারী ওই দ্বীপে গিয়ে বন্ধুত্ব পাতানোর চেষ্টা করেন ভারতীয় নৃতাত্ত্বিক ত্রিলোকনাথ পন্ডিত। তবে তার সেই প্রয়াস সফল হয়নি। ১৯৯৬ সালে সরকারের তরফ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়, সেন্টিনেলিজদের ‘সভ্য’ করে তোলার চেষ্টা আপাতত স্থগিত রাখা হল। ২০০৪ সালে সুনামির পর হেলিকপ্টারে গিয়ে উত্তর সেন্টিনেল দ্বীপে ত্রাণ নিয়ে গিয়েছিল ভারত সরকার। সে ত্রাণ নেওয়ার বদলে উপজাতিরা পাল্টা আক্রমন চালায়।

    ২০০৬ সালে দ্বীপে ঢোকা দু্ই মৎস্যজীবীকে তির ছুড়ে নিমর্ম ভাবে হত্যা করে সেন্টিনেলিজরা। তার পর থেকেই ওই দ্বীপের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেয় সরকার। নিষিদ্ধ দ্বীপের তকমা এঁটে যায় নর্থ সেন্টিনেল দ্বীপের গায়ে। পযর্টকেরা ওই দ্বীপের চায়া মাড়াতেও আজ ভয় পান। দ্বীপের চারপাশে তিন নটিক্যাল মাইল পযর্ন্ত সীমানা নিষিদ্ধ হিসাবে ঘোষিত হয়। চলতি বছরের শুরুতে এই নিয়ম কিছুটা শিথিল করা হয়। নর্থ সেন্টিনেল আইল্যান্ড-সহ কেন্দ্রশাসিত আন্দামান-নিকোবরের মোট ২৯টি জায়গার উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। বলা হয়, ২০২২ সালের ৩১শে ডিসেম্বর পযর্ন্ত সেকানে অবাধে প্রবেশ করতে পারবেন বিদেশিরা। তার জন্য ভারত সরকার থেকে আলাদা করে তাদের অনুমতি নিতে হবে না। তার পরেই এই অঘটন সেন্টিনেলিজদের তিরের আঘাতে মৃত্যু ঘটল মার্কিন পযর্টক জন অ্যালেন চাওয়ের।

No comments:

Post a Comment